বুদ্ধি বৃদ্ধির উপায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বুদ্ধি বৃদ্ধির উপায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুদ্ধির সংজ্ঞা

বুদ্ধির সংজ্ঞা

বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে বুদ্ধির সংজ্ঞা দিয়েছেন – মনোবিজ্ঞানী ক্যাটেল বলেন – “Intelligence is what intelligence does.” অর্থাৎ বুদ্ধি যে কাজ করে তার মধ্যেই বুদ্ধির পরিচয়। ডিয়ারবার্ণ বলেন – “বুদ্ধি হল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে লাভবান হওয়ার ক্ষমতা।” স্টার্ন বলেন – “বুদ্ধি হল নতুন সমস্যা ও অবস্থার সাথে সংগতি বিধানের সাধারণ মানসিক শক্তি।”যে যত তাড়াতাড়ি শিখতে পারে সে ততবেশি বুদ্ধিমান। প্রকৃতি পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে চলার জন্য, আমাদের জীবনে সমস্ত রকম ক্রিয়াকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এবং সমস্ত সমস্যা সমাধান করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বুদ্ধি আমাদের বড় হাতিয়ার।

বুদ্ধি বাড়ানোর উপায়

বুদ্ধি বাড়ানোর উপায়

অন্যের কৌশলীবুদ্ধি দেখে অনেকে ভাবেন আহা আমি যদি এমন হতে পারতাম! একটু যদি বুদ্ধি থাকত আমার! এমন আফসোস যাদের তাদের জন্যই এই আয়োজন। হতাশ হবার কিছু নেই। যদিও বুদ্ধি বেশিরভাগই জেনেটিকাল তারপরও আছে বুদ্ধি বাড়ানোর নানা উপায়। বুদ্ধির প্রখরতা বাড়াতে কয়েকটি উপায় অবলম্বন করতে পারেন।

মানুষের বুদ্ধিমত্তার সঠিক বিকাশ ঘতে উপযুক্ত পরিবেশে। নিজের ইন্দ্রিয় গুলোকে কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে আর কি কাজে লাগানো হচ্ছে, সেগুলোর ওপরই নির্ভর করে বুদ্ধিমত্তার সঠিক বিকাশ। আর তাই আপনি চাইলেই নিজের বুদ্ধিমত্তাকে শানিয়ে নিতে পারবেন সঠিক জীবন চর্চার মাধ্যমে।

আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক সহজেই বুদ্ধিকে ধারালো করার কিছু উপায়।

বুদ্ধি বৃদ্ধির ব্যায়াম

বুদ্ধি বৃদ্ধির ব্যায়াম

ব্যায়াম করুন। ব্যায়াম শুধু যে ওজন কমায় তা নয়, ব্যায়াম মস্তিস্কের স্নায়ুগুলোকে সক্রিয় রাখে,মস্তিস্কে রক্ত চলাচল নিশ্চিত করে এবং প্রাণবন্ত রাখে। ব্যায়ামের মাধ্যমে ব্রেন সেলগুলো আরও বিকশিত ও শক্তিশালী হয় এবং আন্তঃযোগাযোগ বাড়ে ও মস্তিষ্ককে ড্যামাজ হওয়া থেকে প্রতিহত করে। কারণ ব্যায়ামের সময় প্রোটিন বের হয় মস্তিষ্কের সেল থেকে যা নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর নামে পরিচিত। এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য গঠনে সাহায্য করে এবং ব্রেনকে রক্ষা করে। এছাড়া ব্যায়ামের সময় নার্ভ প্রকেটটিং কম্পাউন্ড বের হয়ে ব্রেনকে রক্ষা করে। hippocampus নামক ব্রেন এর একটি জায়গা আছে যা ব্যায়ামের সময় আকারে বড় হয়ে যায়। এর ফলে Alzheimer’s disease প্রতিহত করতে সাহায্য করে। এই রোগ হলে মানুষ স্মৃতি ভুলে যায়। তাই ব্যায়াম শুধু শরীর কেই নয় বরং মস্তিষ্ক কেও সুস্থ রাখে ও রোগ প্রতিরোধ করে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন।

বুদ্ধি বৃদ্ধির খাবার

বুদ্ধি বৃদ্ধির খাবার

যেসব খাবার বুদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে সেগুলো হলো -

মাছের তেলঃ

পুরোনো একটা প্রবাদ আছে , মাছ হলো ব্রেন এর খাদ্য। মাছের তেল আমাদের ব্রেন এর জন্য খুবই জরুরী। এটি মস্তিষ্কের প্রদাহ কমায় ও এটিকে রক্ষা করে। ব্রেন ৫০% ফ্যাট ও লিপিড দিয়ে তৈরি । এর মাঝে ওমেগা ৩ অন্যতম । এটি ব্রেন সেল তৈরি ও মেইনটেইন করে। রক্ষা করে। মাছের তেলে ও তিসির তেলে প্রচুর ওমেগা ৩ পাওয়া যায়।

ভাত রুটিঃ

আমাদের মস্তিষ্ক গ্লুকোজ নির্ভরশীল। বলা যায় যে ,এটিই ব্রেন এর খাবার। আমাদের মস্তিষ্ক ঘন্টায় ৫ গ্রাম গ্লুকোজ খায় কিন্তু জমা রাখতে পারেনা। এই গ্লুকোজ রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত যায়। শরীরের গ্লুকোজের উপর ব্রেন এর ক্ষমতা নির্ভর করে। এজন্য শস্যদানা টাইপ খাবার খাওয়া উচিত যেমন ভাত, রুটি। এগুলো যদিও কার্বোহাইড্রেট এর উত্‍স । এগুলো পড়ে কনভার্ট হয়ে গ্লুকোজ তৈরি করে। চিনি জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত নয়। কেননা বেশি চিনি খেলে তা শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণে তারতম্য ঘটায় যা শরীরে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।

কলাঃ

এতে থাকে প্রচুর ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২। এটি নার্ভ ইমপালস ট্রান্সমিশনে খুব সাহায্য করে। এছাড়া নিউরোট্রান্সমিটার GABA তৈরিতে সাহায্য করে। যা ব্রেন ঠান্ডা রাখে।

কলিজাঃ

মস্তিষ্কের জন্য ২০% অক্সিজেন দরকার হয়। এই অক্সিজেন হিমোগ্লোবিনের সাথে আটকে রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে যায়। আর এই হিমোগ্লোবিনের জন্য দরকার হয় আয়রন। যা কলিজাতে খুব থাকে। তাই গরুর খাসির কলিজা খান। এতে অনেক ভিটামিন বিশেষ করে ভিটামিন বি থাকে প্রচুর।

সামুদ্রিক খাবারঃ

এতে ভিটামিন, প্রোটিন লাইসিন, ম্যাংগানিজ, কপার, লিথিয়াম, জিংক ও আয়োডিন থাকে। যা আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ভালো। ছোটবেলায় আয়োডিনের অভাবের কারণে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হয়ে থাকে অনেকে।

বেশি বেশি বই পড়ুন

বেশি বেশি বই পড়ুন

বুদ্ধিতে ধার দিতে বই পড়ার বিকল্প নেই। বই, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, ফিকশন, নন-ফিকশন যে কোন কিছুই পড়তে পারেন। রাস্তায় জ্যামে সময় নষ্ট না করে বই পড়ুন। অথবা ঘুমাতে যাওয়ার আগেও কিছুক্ষণ করে বই পড়তে পারেন। নিয়মিত বইপত্র পড়লে আপনার বুদ্ধির বিকাশের পাশাপাশি দ্রুত পড়া ও বোঝার অভ্যাস হবে।

সাসপেন্স সমৃদ্ধ জনপ্রিয় ফিকশন বই পড়তে অনেকেই পছন্দ করেন। তবে এধরনের বই পড়ে মস্তিষ্কের কোনও উন্নতি হয় না। অর্থাৎ এধরনের গল্প মাথার কোশকে উদ্দীপিত করার ক্ষমতা রাখে না। তাই নিজের চিন্তাধারা ও লেখনি শক্তি বৃদ্ধি করতে চাইলে এমন কিছু বই বেছে নিতে হবে যেটা আপনাকে আরও ফোকাসড্ হতে সাহায্য করবে। ক্লাসিক কোনও উপন্যাস পঠনপাঠনের মাধ্যমে অনেক সময় পালটে যেতে পারে পৃথিবী সন্বন্ধে আপনার ধারনা। যা আপনাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তাই নিছক পড়ার জন্যও বই বাছুন বুঝেশুনে।

পাজল প্র্যাকটিস করুন

পাজল প্র্যাকটিস করুন

দাবা, সুডোকু, ক্রস ওয়ার্ডস ও পাজল সমাধান করলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে ও মস্তিষ্ক সচল থাকে। এইসব গেম আপনি চাইলে আপনার মোবাইলেই রাখতে পারেন। তাহলে অবসর সময়ে খেলার ছলে বুদ্ধিকে ধারালো করে নিতে পারবেন। এ ধরনের খেলা মস্তিস্কের শক্তি বৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা রাখে।

সময়মত ঘুম

সময়মত ঘুম

সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত আট ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। ঘুম ভালো না হলে নতুন কিছু গ্রহণ করতে বা শিখতে দেরি হয়। কোনও কিছুই মাথায় প্রবেশ করতে চায় না। বুঝতে অসুবিধা হয়। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। আর এটা যদি “Early to bed, Early to rise”-এই প্রবাদবাক্য মেনে হয় তাহলে তা আপনার পক্ষে আরওই ভালো।

কারণ, দেরি করে ঘুমাতে গিয়ে, বেলা করে বিছানা ছাড়লে ক্লান্তি আসে। ঘাটতি হয় মনোযোগের। অর্থাৎ কোনও কিছুতে ফোকাস করতে অসুবিধেয় পড়তে হতে পারে। তাই রাতে নিয়ম করে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গিয়ে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর হতে পারে। এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এটিও বুদ্ধাঙ্ক ঠিক রাখার বা বাড়ানোর একটি পন্থা হিসেবে মেনে চলা যেতে পারে।

টেলিভিশন কম দেখুন

টেলিভিশন কম দেখুন

আমাদের মধ্যে অনেকেই টেলিভিশন দেখতে অভ্যস্ত। এই জিনিসটির প্রতি আমরা এতটাই আসক্ত হয়ে পড়ি যে, খাওয়া দেওয়ার সময়ও চোখ খাবারের দিকে না রেখে আমরা আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে থাকি TV-র দিকে। আমরা জানি না, টেলিভিশন আমাদের মস্তিষ্কের গ্রহণ ক্ষমতা বাড়ায় না। বরং এনার্জি শোষণ করে নেয়।

অর্থাৎ শক্তির অপচয় বা ক্ষয় হয় লাগাতার টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, বুদ্ধাঙ্ক বাড়াতে চাইলে TV-র পর্দায় চোখ রাখুন কম। বুদ্ধির যথাযথ বিকশ ঘটাতে বাড়ির বাচ্চাকেও পারলে টেলিভিশন থেকে দূরে রাখুন।

সারা দিন টিভি দেখার চেয়ে বই পড়া অনেক ভালো। আমরা আমাদের অনেকখানি মূল্যবান সময় এই টেলিভিশন দেখে নষ্ট করি। টেলিভিশনে আসক্তি পরিহার করে বরং সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। পরিবারের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করুন, বন্ধুদের সাথে নতুন অভিজ্ঞতায় সামিল হন, এমন কিছু করুন যাতে চিন্তা করতে হয়। এতে আপনার বুদ্ধি শানিত হবে।

মেডিটেশন

মেডিটেশন

মেডিটেশন এর কাজ হচ্ছে নিজের মগজকে (ব্রেন) নিজে নির্দেশনা দেয়া। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, রোজ ১০ মিনিট মেডিটেশন করলে ২/৩ দিন পর থেকে অনুভব করবেন যে, আপনি যে কোনো কাজে ফোকাস করতে পারছেন, কাজে এনার্জি পাচ্ছেন এবং মানসিক চাপ কমছে। নিয়মিত মেডিটেশন করতে পারলে আপনার মনোযোগ, ইচ্ছা শক্তি, কিছু মনে রাখার ক্ষমতা অনেক গুন বেড়ে যায়।প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট মেডিটেশন করুন।

মেডিটেশন করার পদ্ধতি–

* সুতির আরামদায়ক যে কোন পোষাকই মেডিটেশনের জন্য উপযোগী। * পরিষ্কার পাজামা-পাঞ্জাবী পরে করতে পারেন মেডিটেশন। * ট্রাউজার বা ট্রাক স্যুটও চলবে। * যেকোনো ঢিলেঢালা পোষাক পরতে পারেন। * শরীরে যেকোন অলংকার না রাখাই ভালো।

মেডিটেশন বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। তবে সহজ হল ব্রিদিং মেডিটেশন। দিনে যদি আপনি ২ থেকে ৩ বার ১০-১৫ মিনিট সময় বার করতে পারেন তা হলেই ব্রিদিং মেডিটেশন করা সম্ভব। সাধারনত মেডিটেশন করতে হয় পদ্মাসন, সুখাসন, অর্ধপদ্মাসন, স্বস্তিকা আসনে বসে। দুই হাত থাকবে দু’ধারে, ধ্যান মুদ্রায়।
কোমর, কাঁধ, মাথা একটি সরল রেখায় থাকবে।
শিথিল করে রাখতে হবে কাঁধ।
এই ভঙ্গিতে বসে কিছুক্ষন অন্য সব চিন্তা দূরে সরিয়ে মনকে কেন্দ্রীভূত করুন।
দুর্বল, অসুস্থ শরীর মেডিটেশনের জন্য উপযোগী নয়। তাই সুস্থ হতে হবে আগে।
বাদ দিতে হবে অতিরিক্ত ভোজন।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুম পরিহার করতে হবে।
 - একটি শান্ত জায়গা খুঁজে নিন যেখানে আপনি আরামে বসতে পারেবেন।
 - দুই পা একটির উপর আরেকটি তুলে ক্রুস করে বসুন। তবে পিঠ ও শিরদাঁড়া সোজা রেখে আপনি যে কোন পজিশনে বসতে পারেন। আসলে পিঠ সোজা করে না বসলে ঘুম পেয়ে যাওয়ার প্রবনতা দেখা যায়।
 - দু চোখ আধা বন্ধ করে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর মনোনিবেশ করুন।
 - স্বাভাবিক ভাবে নিশ্বাস নিন। নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করবেন না।
 - বোঝার চেষ্টা করুন কিভাবে হাওয়া নাকের ভিতর দিয়ে ঢুকে ফুসফুসে যাচ্ছে। কি ভাবে ফুসফুসে হাওয়া ভরছে আর আপনার বুক উঠা নামা করছে।
 - একই ভাবে যখন শ্বাস ছাড়ছেন সেই ব্যাপারটাও অনুভব করার চেষ্টা করুন। কিভাবে হাওয়া আপনার নাকের ভেতর দিয়ে আবার আপনার শরীরের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে , এটা বোঝাও মেডিটেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
 - শ্বাস-প্রশ্বাসের এই প্রক্রিয়া ছাড়া আর কোন কিছুর উপরই মনোযোগ দেবেন না। আপনার চারপাশের পরিবেশে কি হচ্ছে তা বিন্দু মাত্র ভাবার চেষ্টা করবেন না। মনে রাখুন-

সারাদিনের কাজের চাপের কারনে আপনার মনে হতেই পারে যে মেডিটেশন আপনাকে আরও ব্যস্ত করে তুলেছে। তবে বাস্তব চিত্রটা একটু অন্যরকম। মেডিটেশন আসলে ভাবনার প্রতি আমাদের সচেতনতা বাড়ায়। মেডিটেশন করার সময় যতবার আপনার মন অন্যদিকে যাবে ততবার শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর মনোনিবেশ করবেন। যত দিন যাবে দেখবেন যে আপনার মন সংযোগ বাড়বে এবং আপনি আরও বেশি মানসিক প্রশান্তি অনুভব করবেন।

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে ইসলামিক উপায়

স্মৃতিশক্তি বাড়াতে ইসলামিক উপায়

আমরা যারা ইসলামকে সামান্য হলেও মেনে চলার চেষ্টা করি তাদের অনেকেরই ইচ্ছা থাকে নতুন নতুন দু’আ, কুর’আনের আয়াত ও সূরা মুখস্থ করার। হয়তো আমরা অনেকেই সে চেষ্টা করেছি। কেউ কেউ সফল হয়েছি এবং হচ্ছি। কেউবা আবার ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়েও দিয়েছি। মুখস্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার পেছনের একটি অন্যতম কারণ হলো এটা মনে করা যে, আমাদের স্মৃতিশক্তি কমে গিয়েছে। তাহলে এই স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর উপায় কী? আসুন এ ব্যাপারে জেনে নেই কিছু কৌশল।

১. ইখলাস বা আন্তরিকতা:
যে কোনো কাজে সফলতা অর্জনের ভিত্তি হচ্ছে ইখলাস বা আন্তরিকতা। আর ইখলাসের মূল উপাদান হচ্ছে বিশুদ্ধ নিয়ত। নিয়তের বিশুদ্ধতার গুরুত্ব সম্পর্কে উস্তাদ খুররাম মুরাদ বলেন,

“উদ্দেশ্য বা নিয়ত হল আমাদের আত্মার মত অথবা বীজের ভিতরে থাকা প্রাণশক্তির মত। বেশীরভাগ বীজই দেখতে মোটামুটি একইরকম, কিন্তু লাগানোর পর বীজগুলো যখন চারাগাছ হয়ে বেড়ে উঠে আর ফল দেওয়া শুরু করে তখন আসল পার্থক্যটা পরিস্কার হয়ে যায় আমাদের কাছে। একইভাবে নিয়ত যত বিশুদ্ধ হবে আমাদের কাজের ফলও তত ভালো হবে।”

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
“তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।” [সূরা আল-বায়্যিনাহঃ ৫]
তাই আমাদের নিয়ত হতে হবে এমন যে, আল্লাহ আমাদের স্মৃতিশক্তি যেনো একমাত্র ইসলামের কল্যাণের জন্যই বাড়িয়ে দেন।

২. দু’আ ও যিকর করা:
আমরা সকলেই জানি আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো কাজেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের উচিত সর্বদা আল্লাহর কাছে দু’আ করা যাতে তিনি আমাদের স্মৃতিশক্তি বাড়িয়ে দেন এবং কল্যাণকর জ্ঞান দান করেন। এক্ষেত্রে আমরা নিন্মোক্ত দু’আটি পাঠ করতে পারি,
“হে আমার পালনকর্তা, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।” [সূরা ত্বা-হাঃ ১১৪]
তাছাড়া যিকর বা আল্লাহর স্মরণও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“…যখন ভুলে যান, তখন আপনার পালনকর্তাকে স্মরণ করুন…” [সূরা আল-কাহ্‌ফঃ ২৪]
তাই আমাদের উচিত যিকর, তাসবীহ (সুবহান আল্লাহ), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ), তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও তাকবীর (আল্লাহু আকবার) – এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আল্লাহকে স্মরণ করা।

৩. পাপ থেকে দূরে থাকা:
প্রতিনিয়ত পাপ করে যাওয়ার একটি প্রভাব হচ্ছে দুর্বল স্মৃতিশক্তি। পাপের অন্ধকার ও জ্ঞানের আলো কখনো একসাথে থাকতে পারে না। ইমাম আশ-শাফি’ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
“আমি (আমার শাইখ) ওয়াকীকে আমার খারাপ স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে অভিযোগ করেছিলাম এবং তিনি শিখিয়েছিলেন আমি যেন পাপকাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখি। তিনি বলেন, আল্লাহর জ্ঞান হলো একটি আলো এবং আল্লাহর আলো কোন পাপচারীকে দান করা হয় না।”
আল-খাতীব আল-জামী'(২/৩৮৭) গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া বলেনঃ
“এক ব্যক্তি মালিক ইবনে আনাসকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হে আবদ-আল্লাহ, আমার স্মৃতিশক্তিকে শক্তিশালী করে দিতে পারে এমন কোন কিছু কি আছে? তিনি বলেন, যদি কোন কিছু স্মৃতিকে শক্তিশালী করতে পারে তা হলো পাপ করা ছেড়ে দেয়া।’”
যখন কোনো মানুষ পাপ করে এটা তাকে উদ্বেগ ও দুঃখের দিকে ধাবিত করে। সে তার কৃতকর্মের ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তার অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায় এবং জ্ঞান অর্জনের মতো কল্যাণকর ‘আমল থেকে সে দূরে সরে পড়ে। তাই আমাদের উচিত পাপ থেকে দূরে থাকার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা।

৪. বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করা:
একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখবো যে, আমাদের সকলের মুখস্থ করার পদ্ধতি এক নয়। কারো শুয়ে পড়লে তাড়াতাড়ি মুখস্থ হয়, কারো আবার হেঁটে হেঁটে পড়লে তাড়াতাড়ি মুখস্থ হয়। কেউ নীরবে পড়তে ভালোবাসে, কেউবা আবার আওয়াজ করে পড়ে। কারো ক্ষেত্রে ভোরে তাড়াতাড়ি মুখস্থ হয়, কেউবা আবার গভীর রাতে ভালো মুখস্থ করতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ উপযুক্ত সময় ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ঠিক করে তার যথাযথ ব্যবহার করা। আর কুর’আন মুখস্থ করার সময় একটি নির্দিষ্ট মুসহাফ (কুর’আনের আরবি কপি) ব্যবহার করা। কারণ বিভিন্ন ধরনের মুসহাফে পৃষ্ঠা ও আয়াতের বিন্যাস বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট মুসহাফ নিয়মিত ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের মধ্যে তার একটি ছাপ পড়ে যায় এবং মুখস্থকৃত অংশটি অন্তরে গভীরভাবে গেঁথে যায়।

৫. মুখস্থকৃত বিষয়ের উপর ‘আমল করা: আমরা সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, কোনো একটি বিষয় যতো বেশিবার পড়া হয় তা আমাদের মস্তিষ্কে ততো দৃঢ়ভাবে জমা হয়। কিন্তু আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে অতো বেশি পড়ার সময় হয়তো অনেকেরই নেই। তবে চাইলেই কিন্তু আমরা এক ঢিলে দু’পাখি মারতে পারি। আমরা আমাদের মুখস্থকৃত সূরা কিংবা সূরার অংশ বিশেষ সুন্নাহ ও নফল সালাতে তিলাওয়াত করতে পারি এবং দু’আসমূহ পাঠ করতে পারি সালাতের পর কিংবা অন্য যেকোনো সময়। এতে একদিকে ‘আমল করা হবে আর অন্যদিকে হবে মুখস্থকৃত বিষয়টির ঝালাইয়ের কাজ।

৬. অন্যকে শেখানো:
কোনো কিছু শেখার একটি উত্তম উপায় হলো তা অন্যকে শেখানো। আর এজন্য আমাদেরকে একই বিষয় বারবার ও বিভিন্ন উৎস থেকে পড়তে হয়। এতে করে ঐ বিষয়টি আমাদের স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।

৭. মস্তিষ্কের জন্য উপকারী খাদ্য গ্রহণ: পরিমিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণ আমাদের মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য একান্ত আবশ্যক। অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ আমাদের ঘুম বাড়িয়ে দেয়, যা আমাদের অলস করে তোলে। ফলে আমরা জ্ঞানার্জন থেকে বিমুখ হয়ে পড়ি। তাছাড়া কিছু কিছু খাবার আছে যেগুলো আমাদের মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী। সম্প্রতি ফ্রান্সের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যয়তুনের তেল চাক্ষুস স্মৃতি (visual memory) ও বাচনিক সাবলীলতা (verbal fluency) বৃদ্ধি করে। আর যেসব খাদ্যে অধিক পরিমাণে Omega-3 ফ্যাট রয়েছে সেসব খাদ্য স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যকলাপের জন্য খুবই উপকারী। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য অনেক ‘আলিম কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য গ্রহণের কথা বলেছেন। ইমাম আয-যুহরি বলেন, “তোমাদের মধু পান করা উচিত কারণ এটি স্মৃতির জন্য উপকারী।”
মধুতে রয়েছে মুক্ত চিনিকোষ যা আমাদের মস্তিষ্কের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া মধু পান করার সাত মিনিটের মধ্যেই রক্তে মিশে গিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। ইমাম আয-যুহরি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি হাদীস মুখস্থ করতে চায় তার উচিত কিসমিস খাওয়া।”

৮. পরিমিত পরিমাণে বিশ্রাম নেয়া:
আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা ব্যস্ত অফিসের মতো কাজ করে। এটি তখন সারাদিনের সংগৃহীত তথ্যসমূহ প্রক্রিয়াজাত করে। তাছাড়া ঘুম মস্তিষ্ক কোষের পুণর্গঠন ও ক্লান্তি দূর করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে দুপুরে সামান্য ভাতঘুম আমাদের মন-মেজাজ ও অনুভূতিকে চাঙা রাখে। এটি একটি সুন্নাহও বটে। আর অতিরিক্ত ঘুমের কুফল সম্পর্কে তো আগেই বলা হয়েছে। তাই আমাদের উচিত রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাওয়াহ বিতরণ না করে নিজের মস্তিষ্ককে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া।

৯. জীবনের অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারসমূহ ত্যাগ করা:
বর্তমানে আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া ও জ্ঞান অর্জনে অনীহার একটি অন্যতম কারণ হলো আমরা নিজেদেরকে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কাজে জড়িয়ে রাখি। ফলে কোনো কাজই আমরা গভীর মনোযোগের সাথে করতে পারি না। মাঝে মাঝে আমাদের কারো কারো অবস্থা তো এমন হয় যে, সালাতের কিছু অংশ আদায় করার পর মনে করতে পারি না ঠিক কতোটুকু সালাত আমরা আদায় করেছি। আর এমনটি হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে নিজেদেরকে আড্ডাবাজি, গান-বাজনা শোনা, মুভি দেখা, ফেইসবুকিং ইত্যাদি নানা অপ্রয়োজনীয় কাজে জড়িয়ে রাখা। তাই আমাদের উচিত এগুলো থেকে যতোটা সম্ভব দূরে থাকা।

১০. হাল না ছাড়া:
যে কোনো কাজে সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো হাল না ছাড়া। যে কোনো কিছু মুখস্থ করার ক্ষেত্রে শুরুটা কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্ক সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেয়। তাই আমাদের উচিত শুরুতেই ব্যর্থ হয়ে হাল না ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।