কখন বুঝবে দেশ ও সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে?
কখন বুঝবে দেশ ও সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে?
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী | প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর নিুোক্ত কথাগুলো একজন শুভানুধ্যায়ী ই-মেইল করে পাঠিয়েছেন।
‘কখন বুঝবে
একটা দেশ ও সমাজ
নষ্ট হয়ে গেছে?
যখন দেখবে-
দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে গেছে,
ধনীরা কৃপণ হয়ে গেছে,
মূর্খরা মঞ্চে বসে আছে,
জ্ঞানীরা পালিয়ে যাচ্ছে এবং
শাসকরা মিথ্যা কথা বলছে।’
-হজরত আলী (রা.)
প্রায় দেড় হাজার বছর আগে উচ্চারিত এই বাণী আজকের দিনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রযোজ্য, সেটাই ভাবছি।
আমাদের দরিদ্ররা কি ‘ধৈর্যহারা’ হয়ে গেছে?
না, এ দেশের প্রতিটি মানুষের মনে অনেক যন্ত্রণা। তাদের মুখে মুখে হাজারও অভিযোগ। কিন্তু তাদের ধৈর্য অপরিসীম। তারা অল্পতে তুষ্ট। পড়ে পড়ে মার খায়, তারপরও সালাম ঠোকে।
আমাদের ধনীরা কি ‘কৃপণ’ হয়ে গেছেন?
না, তারা কৃপণ নন। তারা বিদেশী খান, বিদেশী পরেন, বিদেশী মালামাল কেনার সময় দোকানসুদ্ধু কিনে ফেলতে চান। তারা মোটেই কৃপণ নন। তবে একটা জায়গায় তারা সত্যিই ‘কৃপণ’। তারা ‘হলমার্ক’, ‘কুইক রেন্টাল’, ‘পদ্মা সেতু’ ইত্যাদি শর্টকাট আঙুল-ফোলানো কারবারের প্রতি যতটা আকৃষ্ট, কর ফাঁকি, ওভার-আন্ডার ইনভয়েসিং, মানি লন্ডারিং ইত্যাদির সুযোগ যেভাবে লুফে নেন, পরকালে সত্তর গুণ ফেরত পাওয়ার লাভজনক তেজারতিতে যতটা উৎসাহী, তার ছিটাফোঁটাও দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগে উৎসাহী নন। যেখানে মুনাফা কিছু কম তার ধারেকাছেও তারা হাঁটতে চান না। এ দেশের দরিদ্র মানুষের শ্রমের উপার্জনে গড়ে ওঠা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় বিনামূল্যে বিদ্যা অর্জন করার সুযোগ নিয়ে তারা গাছের মগডালে উঠেছেন। এখন সুযোগ পেলেই ভিন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
সেই বিচারে তাদের এই স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যকে রাষ্ট্র বা জাতির সঙ্গে ‘প্রতারণা’ বলা গেলেও ‘কৃপণতা’ বলা যায় না। আমাদের জাতীয় ‘রঙ্গমঞ্চে’ যারা আছেন তারা কি মূর্খ?
না, তাদের ঢালাওভাবে মূর্খ বলার কোনোই সুযোগ নেই। তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত। উকিল-ব্যারিস্টার, প্রফেসর-ভাইস-চ্যান্সেলর, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার সবই আছেন। যদিও সেই শিক্ষা কাজে না লাগিয়ে তারা নীরবে নেতৃপদতলে প্রণিপাত হয়ে থাকেন। তবে তাকে আর যাই হোক, মূর্খতা বলা যাবে না। তারা বুদ্ধিমান। বুঝেশুনে লাভ-লোকসানের হিসাব কষেই কাজ করছেন। শিক্ষা ও বুদ্ধিমত্তার এর চেয়ে লাভজনক ব্যবহার আর কি হতে পারে?
আমাদের জ্ঞানীরা কি পালিয়ে যাচ্ছেন?
না, তারা মোটেই পালিয়ে যাচ্ছেন না। তারা রাজনীতির পেছনের কাতারে বসে ক্ষমতাবানদের নিরলস সেবা দিয়ে বিদ্যার তেজারতি চালিয়ে বহাল তবিয়তে মঞ্চ আলো করেই থাকছেন। তারা পালাবেন কেন?
পালিয়ে গেছে যাত্রামঞ্চের সেই সুপরিচিত ভাঁড়টি, যার নাম ‘বিবেক’।
আমাদের শাসকরা কি মিথ্যা কথা বলেন?
জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলেন, মিথ্যা তিন প্রকারের : ‘অর্ধ-মিথ্যা’, ‘মিথ্যা’ ও ‘সংখ্যাতত্ত্ব’।
আমাদের শাসকরা প্রতিদিনই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা সুখবর তুলে ধরছেন। পারিবারিক বাজেট মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও সরকারি বিশেষজ্ঞদের ‘বিজ্ঞাপনী বক্তৃতা’র চিত্তাকর্ষক সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সব অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষের পেট খালি থাকলেও মন ভরে যায় মোহনীয় সংখ্যাতত্ত্বে।
ব্রিটিশ আমলের কৃষক নেতা আবদুর রহমান খান সাহেব সুরসিক ব্যক্তি ছিলেন। ষাটের দশকে এই বর্ষীয়ান নেতা সভা-বৈঠক মাতিয়ে রাখতেন। একদিন মরহুম আতাউর রহমান খান সাহেবের বৈঠকখানায় দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনায় তিনি বলে উঠলেন, ‘শোনেন। আমাদের গ্রামের হামিদের ছয়-সাতটা বাচ্চা। ওদের দুষ্টামিতে গ্রামের লোক অতিষ্ঠ। তার বন্ধু করিম একদিন তাকে বলছে, ‘কিরে হামিদ, তোর বউ নাকি আবার পোয়াতি হইছে?’ হামিদ নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দেয় : ‘হ ভাই, কি আর করমু। পরের মাইয়া ঘরে আনছি। পেট তো খালি রাখতে পারি না!’ সব দেশেই শাসকরা কম-বেশি এভাবেই দেশবাসীর পেট ভরিয়ে থাকে।
তবে শাসকরা সব সময়ই তার প্রতিপক্ষকে ‘মিথ্যুক’ বলে থাকে। ক’দিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘বেগম জিয়া মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশে-বিদেশে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।’ অপরদিকে বেগম জিয়ার লোকেরা প্রতিদিনই সরকারি দলকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করে মাঠ গরম করে রাখছেন। দুয়ে দুয়ে চার হলে অতঃপর দেশের রাজনীতিকরা যা বলেন তার সবই ‘মিথ্যা’।
আমাদের ক্ষমতাসীন সরকার ও ক্ষমতাচ্যুত সরকার এভাবেই প্রতিনিয়ত পরস্পরকে এমন ভাষায় আক্রমণ করে কথা বলেন, যা গ্রামের মহিলাদের ‘কাজিয়া’কেও হার মানায়।
গ্রাম্য জীবনে মেয়েদের ‘কাজিয়া’ পরম উপভোগ্য বিষয়। আমি আমার শৈশবের প্রথম ৫-৬ বছর গ্রামে কাটিয়েছিলাম। বেশিরভাগ সময় কাটাতাম নানার বাড়িতে। নানীর পরম আদরের ধন ছিলাম। নানার বাড়ির অনেক স্মৃতির মধ্যে একটি হচ্ছে ‘কাজিয়া’। নোয়াখালীর ভাষায় ‘কইজ্জা’।
আমার নানার বাড়ির ছিল তিন ‘হিস্যা’। বাড়ির ‘উত্তরের হিস্যা’ ও ‘দক্ষিণের হিস্যা’র দুই মহিলার বিরোধ মাঝেমধ্যে কাজিয়াতে গড়িয়েছে। প্রথমে দু’জনে কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে যার যার উঠানের নিরাপদ দূরত্বে থেকে পরস্পরের দিকে বাক্যবাণ ছুড়তে থাকেন। তারপর মাঝখানের উঠানটা হয়ে ওঠে তাদের রণক্ষেত্র। সেই রণক্ষেত্রের এক প্রান্ত থেকে একজন চীৎকার করে গালাগাল দিতে দিতে আঙুল উঁচিয়ে অপরজনের দিকে এগিয়ে আসছেন। অপরজন তখন তার হিস্যার উঠানে পিছু হটে সেখান থেকে ততধিক তীব্র ভাষায় জবাব দিচ্ছেন। ‘ইনি’ ক্লান্ত হয়ে গেলে ‘উনি’ একইভাবে কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে হাত উঁচু করে ধেয়ে আসেন। ‘ইনি’ তখন পিছু হটে নিজ উঠানের সীমানায়। বাড়ির মহিলা এবং ছেলেমেয়েরা চারপাশে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে সেই অপূর্ব ক্রীড়াশৈলী উপভোগ করছে। কেউবা মোড়া টেনে এনে পানের বাটা হাতে জুত করে বসেছে (ভিআইপি গ্যালারি)। এভাবেই পালাক্রমে চলতে থাকে দুই পক্ষের ‘কবি’ (নোয়াখালীতে ‘কবি’ বলতে বোঝায় অশ্লীল সুরেলা গালাগালি)। একসময় দু’জনের গলা ভেঙে যায়। ঘণ্টা-দু’ঘণ্টা চলার পর টি-ব্রেক। দর্শকরা বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখার আনন্দ নিয়ে নিজ নিজ ঘরে। গ্রামের বিনোদনহীন জীবনে এক পশলা বিনোদন।
আমাদের জাতীয় রাজনীতির দুই মহীয়সী সেভাবেই জাতির জীবনে বিনোদনের ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছেন। পেট না ভরলেও মন ভরছে। তাদের দেশবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
দরিদ্রের অসীম ধৈর্য
হজরত আলী (রা.)-এর কথার এদিক-ওদিক করা হবে সখ্ত্ বেয়াদবি। তবু একটা প্রশ্ন মনে জাগে। শেরে খোদা প্রথমেই দরিদ্রদের ধৈর্যহারা হওয়ার কথা বলেছেন। দরিদ্ররা কি সহজে ধৈর্যহারা হয়?
দরিদ্ররা সহজে ধৈর্যহারা হয় না বটে, তবে তারা ধৈর্যহারা হয়ে গেলে বিপদ। সে অবস্থাকে বলা হয় ‘নৈরাজ্য’- Anarchy। ফরাসি বিপ্লবকে Anarchy ছাড়া আর কী বলা যায়? Rosa Luxemburg-কে Anarch-র পক্ষে তার তত্ত্ব ও কর্মকাণ্ডের জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসতে হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও সেভাবে অনেকটা Anarchy দিয়েই শুরু হয়েছে। অতি সম্প্রতি দিল্লির আম আদমির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল নিজেকে Anarchist ঘোষণা দিয়ে বিপদে পড়েছেন। আমাদের শাসকদের অবশ্য সেজন্য ভয়ের কিছু নেই। কারণ, বাংলাদেশের দরিদ্ররা এখন খুবই ধৈর্যশীল।
এই ধৈর্য অবশ্য এমনি এমনি আসেনি। পারস্য দেশের দুই ভাই। ছোটটি খুব চালাক-চতুর। কিন্তু বড়টি একেবারেই সরল-সোজা। সেই শহরে ছিল এক সুন্দরী রাজকন্যা। ভীষণ দজ্জাল প্রকৃতির। তার শর্ত, সে যাকে বিয়ে করবে তাকে প্রতি রাতে একশ’ ঘা জুতার বাড়ি খেতে হবে। রাজকন্যার রূপে আকৃষ্ট হয়ে এই কঠিন শর্ত মেনে নিয়ে অনেকে তাকে বিয়ে করতে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু কয়েক দিন পরেই ছাড়াছাড়ি। প্রতিদিন একশ’ জুতার বাড়ি আর কত সহ্য করা যায়। (মনে হয় আজকের দিনের কোনো নারীবাদী লেখিকা টাইম মেশিনে চড়ে পেছনে গিয়ে এই গল্পটি লিখেছেন)। তারপরও সেই কঠিন শর্ত মেনে নিয়েই রাজবাড়িতে উপস্থিত হল বোকা বড় ভাইটি। দু’দিন পর সে রাজবাড়ি থেকে পালিয়ে এলো। দজ্জাল রাজকন্যার জুতার আঘাতে তার চাঁদিতে একটাও চুল অবশিষ্ট নেই। ছোট ভাইটি সব শুনে বলল, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। বড় ভাই তাকে অনেক বারণ করল। কিন্তু সে কিছুই শুনল না। রাজবাড়িতে গিয়ে ওই দজ্জাল মেয়েকে বিয়ে করল।
দু’দিন, দশ দিন, মাস যায় ছোট ভাইটি রাজবাড়িতে বসবাস করছে। একদিন তাকে কাছে পেয়ে বড় ভাই লক্ষ্য করল তার মাথার সব চুল যথাস্থানেই আছে। কী ব্যাপার, কোন জাদু-মন্ত্রে এমনটি হল? বড় ভাই তার কাছে জানতে চায়।
‘খুব কিছু করতে হয়নি। কেবল শাদির পহেলা রাতে বিড়াল মেরেছি।’ -ছোটটি জানায়।
মানে?
বিয়ের রাতে প্রথমেই রাজকন্যা বলল, ‘খিদে পেয়েছে, খাব’। দু’জনে খেতে বসলাম। আর তখনই রাজকন্যার প্রিয় বিড়ালটি লাফ দিয়ে এসে ডাকল, মিউ, মিউ...। সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তলোয়ার বের করে একটা কোপ বসিয়ে দিলাম। রাজকন্যা হাঁ হাঁ করে তেড়ে উঠল- ‘এ কী হচ্ছে-? এ কী হচ্ছে-?’ বললাম, ‘আমি বেয়াদবি একেবারেই পছন্দ করি না।’ বলেই আরেক কোপ দিয়ে বিড়ালটাকে একেবারে দু’টুকরা করে ফেললাম। মেঝেটা রক্তাক্ত হয়ে গেল। রাজকন্যা ভয়ে সাদা। তারপর একেবারে চুপ।
সেই থেকে পারস্য দেশে প্রবাদ- ‘শাদির পহেলা রাতে মারিবে বিড়াল’।
পাদটীকা
আমাদের মহান শাসকবৃন্দ ১৯৭২ সালের সেই পহেলা রাত থেকে বিড়াল মারতে মারতে এ দেশের মানুষকে ‘হাঁটু ভাঙা দ’ বানিয়ে ছেড়েছেন। এখন ওই রাজকন্যার মতো তাদেরও সব হাঁক-ডাক শেষ।
অতঃপর তাহারা দুই শরিক কেবল ২০১৯ সাল পর্যন্ত নয়, অনন্তকাল ধরিয়া সুখে-শান্তিতে বংশপরম্পরায় পালাক্রমে রাজ্য শাসন করিয়া চলিবেন।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক